হোমপেজে ফিরে যান
প্রফেসর আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ 13 Jul, 2026

বাষ্প-তাপ শোধিত আম : বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

বাষ্প-তাপ শোধিত আম : বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বাষ্প-তাপ শোধিত আম : বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
প্রফেসর আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ

বাংলাদেশের আম শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটির স্বাদ, সুবাস, ঐতিহ্য কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির এক অনন্য প্রতীক। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত আম দেশীয় বাজারে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। গোপালভোগ, হিমসাগর/ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, আ¤্রপালি, হাড়িভাঙা কিংবা বারি ৪, ফজলি, গৌড়মতি, কাটিমন, বানানাম্যঙ্গো- প্রতিটি জাতের আছে নিজস্ব স্বাদ, ঘ্রাণ ও বাজারমূল্য।

তবে বৈশ্বিক বাজারে সফলভাবে প্রবেশ করতে হলে শুধু সুস্বাদু আম উৎপাদন যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন জানতে চান - ফলটি কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে, বালাইনাশকের মাত্রা নিরাপদ ছিলো কি না, ফলের মাছি পোকা বা অন্য কোনো কোয়ারেন্টাইন পেস্ট আছে কি না, কোনো বাগান থেকে এসেছে, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিং করা হয়েছে, এবং রপ্তানির আগে কোনো শোধনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রশ্নগুলোর বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারলেই বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। আর এখানেই বাষ্প-তাপ শোধন বা Vapor Heat Treatment VHT বাংলাদেশের আম রপ্তানিতে এক নতুন সম্ভাবনার সুযোগ এনে দিয়েছে।

VHT বা বাষ্প-তাপ শোধন হলো একটি আধুনিক, রাসায়নিকবিহীন ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফলের শোধন প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় আমকে নিয়ন্ত্রিতভাবে উত্তপ্ত করা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ফলের ভেতরে থাকা ফলের মাছি পোকার ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করা। এতে আম কোয়ারেন্টাইন পেস্ট থেকে ঝুঁকিমুক্ত হয় এবং কঠোর আমদানি-নিয়ন্ত্রিত বাজারে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করে। এখানে রাসায়নিক ফিউমিগেশন ব্যবহার করা হয় না, তাই স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। আমের স্বাদ, রং, সুবাস ও গুণগত মান অক্ষুন্ন থাকে। আন্তর্জাতিক কোয়ারেন্টাইন মানদ- পূরণে অপরিহার্য। প্রিমিয়াম মূল্য বাজারে প্রবেশের জন্য বাধ্যতামূলক, বিশেষত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে। বাষ্প-তাপ শোধন আমের সংরক্ষণকাল বাড়িয়ে দীর্ঘ দূরত্ব পরিবহনের সময় সতেজতা নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশ বিশ্বের দশটি প্রধান আম উৎপাদনকারী দেশের একটি। দেশে প্রায় দুই শতাধিক জাতের আম চাষ হলেও বানিজ্যিকভাবে চাষ হয় ১০-১৫টি জাত। কিন্তু আমের উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি এখনো সীমিত। বার্ষিক প্রায় ২৫ লক্ষ টন আম উৎপাদন হলেও এ যাবতকালে সর্বোচ্চ রপ্তানী হয়েছে ৩১০০ মেট্রিক টন। এই স্বল্প রপ্তানীর পিছনে অনেকগুলো কারনের অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী উৎপাদন, শোধন, প্যাকেজিং, কোল্ড-চেইন ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থার ঘাটতি।
রপ্তানির জন্য আমকে বাগান থেকেই পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করতে হবে। উত্তম কৃষি চর্চা বা এঅচ, সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা বা ওচগ, ফল ব্যাগিং, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার, পরিপক্ব অবস্থায় সংগ্রহ, পরিচ্ছন্ন ক্রেট ব্যবহার এবং বাগানভিত্তিক রেকর্ড সংরক্ষণ - এসব বিষয় নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে চালান প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা শুধু ফলের সৌন্দর্য বা স্বাদ দেখেন না; তারা নিরাপদতা, উৎস, পরীক্ষার রিপোর্ট, প্যাকহাউসের মান এবং শোধনপ্রক্রিয়ার তথ্যও যাচাই করেন। তাই বাংলাদেশের আমকে “মৌসুমি ফল” থেকে “রপ্তানিযোগ্য মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে পুরো ভ্যালু-চেইনকে আধুনিক করতে হবে।

বাংলাদেশি আমের প্রচলিত বাজারের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ইতালি, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও কানাডা উল্লেখযোগ্য। তবে এসব বাজারের বড় অংশ এখনো প্রবাসী বাংলাদেশী বা এথনিক মার্কেটভিত্তিক। বাংলাদেশের প্রকৃত সম্ভাবনা হলো মূলধারার সুপারমার্কেট, প্রিমিয়াম ফলের বাজার এবং কঠোর কোয়ারেন্টাইন-নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোতে প্রবেশ করা।

চীন বাংলাদেশের আমের জন্য একটি বড় সম্ভাবনাময় বাজার। কিন্তু এই বাজারে প্রবেশ করতে হলে বাগান নিবন্ধন, প্যাকিং ফ্যাক্টরি নিবন্ধন, এঅচ ও ওচগ বাস্তবায়ন, রাসায়নিক ব্যবহারের রেকর্ড, ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট সুবিধা, কোল্ড-চেইন, ইংরেজি ও চীনা ভাষায় লেবেলিং এবং ছজ-ভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ চীনের বাজার শুধু রপ্তানির সুযোগ নয়; এটি বাংলাদেশের আম উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার একটি বাস্তব পরীক্ষা।
বাংলাদেশে বাষ্প-তাপ শোধন সুবিধা চালু হওয়া আম রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ঢাকার গাবতলীতে অবস্থিত ইঅউঈ-এর ঠঐঞ প্ল্যান্ট প্রতিদিন প্রায় ১২ টন তাজা আম শোধনের সক্ষমতা তৈরি করেছে। এ মৌসুম থেকে এটি পুরোদমে চালু হবে। এর ফলে বাংলাদেশি আমকে ফলের মাছি পোকা মুক্ত, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক বাজারোপযোগী করে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে শুধু একটি প্ল্যান্ট দিয়ে বৃহৎ রপ্তানি বাজার ধরা সম্ভব নয়। প্রধান আম উৎপাদন অঞ্চলগুলোতে আঞ্চলিক ঠঐঞ কেন্দ্র, আধুনিক প্যাকহাউস, গ্রেডিং লাইন, প্রি-কুলিং ব্যবস্থা, কোল্ড স্টোরেজ, রেফ্রিজারেটেড পরিবহন এবং স্বীকৃত পরীক্ষাগার গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বাগান থেকে পুরো সাপ্লাই চেইনে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি চালু করা জরুরি।

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে ফলের মাছি পোকা ও অন্যান্য কোয়ারেন্টাইন পেস্ট নিয়ন্ত্রণের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। তারা কোনোভাবেই তাদের দেশে ফলের মাছি পোকা ঝুঁকি গ্রহন কওে না। তাই এসব বাজারে প্রবেশের জন্য ঠঐঞ বা অনুমোদিত ফাইটোস্যানিটারি শোধন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সফল আম রপ্তানিকারক দেশগুলো - যেমন ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে VHT ,HWT ,irradiation এবং উন্নত প্যাকহাউস ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করছে। ফিলিপাইনের “কারাবাও” আম বা থাইল্যান্ডের প্রিমিয়াম আম আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু স্বাদের কারণে নয়, বরং মান-নিয়ন্ত্রণ, সার্টিফিকেশন ও কোয়ারেন্টাইন সম্মতির কারণে জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশের গোপালভোগ, হিমসাগর/ ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাতি, আ¤্র্রপালি স্বাদে কোনো অংশে কম নয়; কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতা শুধু স্বাদ দেখে আম কেনে না। তারা জানতে চায়- ফলটি কীভাবে উৎপাদিত, কী কী কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে, গজখ সীমার মধ্যে আছে কি না, কোনো বাগান থেকে এসেছে, কোনো প্যাকহাউসে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে, শোধনপ্রক্রিয়ার রেকর্ড আছে কি না, প্যাকেজিং ও লেবেলিং আন্তর্জাতিক মানের কি না।

বাংলাদেশি আমকে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থানে নিতে হলে রপ্তানিকারকদের কিছু বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, যে দেশে আম পাঠানো হবে, সেই দেশের ফাইটোস্যানিটারি, গজখ, প্যাকেজিং, লেবেলিং ও সার্টিফিকেশন শর্ত আগে থেকেই জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, আম সংগ্রহের আগেই বালাইনাশক অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করতে হবে, যাতে রপ্তানির সময় ঝুঁকি কমে। তৃতীয়ত, প্রতিটি চালানে বাগানের নাম, ব্যাচ কোড, সংগ্রহের তারিখ, শোধনপ্রক্রিয়ার তথ্য, প্যাকহাউস কোড ও রপ্তানিকারকের বিবরণ সংরক্ষণ করতে হবে।

প্যাকেজিং হতে হবে পরিচ্ছন্ন, মজবুত, বায়ুচলাচলযোগ্য এবং বাজারভিত্তিক লেবেলিংসহ। ছজ কোডের মাধ্যমে ক্রেতাকে বাগানের ইতিহাস, উৎপাদনপদ্ধতি, সার্টিফিকেশন ও নিরাপত্তা তথ্য জানানো গেলে বাংলাদেশের আমের প্রতি আস্থা আরও বাড়বে।
রপ্তানিমুখী আম খাতকে এগিয়ে নিতে শুধু কৃষক বা রপ্তানিকারকের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। দরকার সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে Mango Export Coordination গঠন করা যেতে পারে, যেখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, EPB ,BADC ল্যাব, রপ্তানিকারক, কৃষক সমবায় ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করবে। ক্ষুদ্র কৃষকদের রপ্তানি ভ্যালু-চেইনে যুক্ত করতে উত্তম কৃষি চর্চার group certification, contract farming and Ges cooperative model চালু করা যেতে পারে। সহজ ঋণ, পরীক্ষার ফি সহায়তা, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ওয়ান-স্টপ রপ্তানি ডকুমেন্টেশন, বিমানবাড়া কমানো, কার্গো সুবিধা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হলে এই খাত দ্রুত এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশের আমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর মিষ্টতা, স্বাদ, সুবাস ও জাতবৈচিত্র। তাই বাংলাদেশের আমের একটি শক্তিশালী আর্ন্তজাতিক ব্র্যান্ড তৈরি করা জরুরি। প্রথমে ছোট আকারে pilot shipmen, এরপর নিয়মিত ক্রেতা তৈরি এবং পরে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি-এই ধাপে এগোলে বাংলাদেশের আম একটি নির্ভরযোগ্য রপ্তানি পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশে আমের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরাপদ আম উৎপাদনের জন্য দেশে এখন বছরে প্রায় ১৫-২০ কোটি ফ্রুট ব্যাগিং ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে এখন প্রায় ছয় মাস নানা জাতের তাজা আম পাওয়া যায়। অতিঘন পদ্ধতিতে আম চাষে আমের ব্যবস্থাপনা ভালো হয় তাই উৎপাদনও বেশী হয়। বাংলাদেশের আমের সামনে এখন বড় সুযোগ অপেক্ষা করছে। উৎপাদন আছে, জাত আছে, স্বাদ আছে, কৃষক আছে, বাজারও আছে। এখন দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন, আন্তর্জাতিক মানের শোধনপ্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা, শক্তিশালী কোল্ড-চেইন, কার্যকর নীতি সহায়তা এবং পেশাদার ব্র্যান্ডিং।

বাষ্প-তাপ শোধন বা VHT শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; এটি বাংলাদেশের আমকে উচ্চমূল্যের বিশ্ববাজারে প্রবেশ করানোর দরজা। সঠিক বিনিয়োগ, সমন্বিত পরিকল্পনা ও মাননিষ্ঠ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের আম একদিন পোশাক ও চিংড়ির মতোই বৈদেশিক আয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরিচিত পণ্য হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের মধুর আম তখন শুধু দেশের মানুষের রসনাতেই নয়, বিশ্বের ভোক্তার টেবিলেও গর্বের সঙ্গে জায়গা করে নেবে, এই আমাদের প্রত্যাশা।
শেয়ার করুন:

কমেন্টস (0)

এখনো কোনো কমেন্ট করা হয়নি। প্রথম কমেন্টটি আপনিই করুন!

একটি কমেন্ট লিখুন