হোমপেজে ফিরে যান
শারমীন আক্তার 13 Jul, 2026

লতিরাজ কচুর চাষাবাদ পদ্ধতি

লতিরাজ কচুর চাষাবাদ পদ্ধতি
লতিরাজ কচুর চাষাবাদ পদ্ধতি
শারমীন আক্তার

পুষ্টি ও স্বাদের দিক থেকে কচু একটি অন্যতম সবজি, বিভিন্ন ধরনের ভিটামিনের সাথে সাথে প্রচুর লৌহ যোগান দিয়ে থাকে কচু। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কচু চাষ করা যায়। আমাদের দেশে লতিরাজ কচু অনেক জনপ্রিয় সবজি। বর্তমানে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও লতি রপ্তানি করা হচ্ছে। কচুর লতি মূলত পানি কচুই। লতিরাজ কচুতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি রয়েছে। উৎপাদনের দিক দিয়ে মুখীকচুর পরই কচুর লতির স্থান। বাজারে প্রতি কেজি লতি ৭০-৮০ টাকা বিক্রি হয়। লতিরাজ কচু চাষ করে খুব সহজে লাভবান হওয়া যায়।

চাষাবাদ পদ্ধতি :
উপযুক্ত জমি ও মাটি
কচুর লতি উষ্ণ জলবায়ুতে ভালো জন্মে। কচুর লতি চাষের জন্য জমি হতে হবে মাঝারি নিচু যেখানে বৃষ্টির পানি জমে। লতি কচু অল্প আলো বা ছায়াতেও ভালো জন্মাতে পারে। প্রখর রোদে ভালো ফলন হয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতে কচুর লতির চাষ করা যায় তবে পলি দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে কচুর লতি চাষ করা উত্তম।

লতি কচুর জাত সমূহ
আমদের দেশে বেশ কয়েক প্রকার কচুর লতির জাত রয়েছে। এসব জাতের গাছ ছোট, পাতা ছোট ও চিকন সরু ও লম্বা লতি উৎপাদন করা হয়। উন্নত জাতের লতি লম্বা ও মোটা এবং গিটযুক্ত, খাটো ও মোটা, শাসাল ও মাংসল দ্রুত গলে যায়। বারি পানি কচু ১ ও বারি পানি কচু-২ এ দেশে উদ্ভাবিত পানিকচুর দুটি উন্নত জাত। এ দুটি জাত লতি উৎপাদনের জন্য ভালো জাত।

লতিরাজ কচুর বৈশিষ্ট্য
লতিরাজ জাতের কা- অপেক্ষা লতির প্রাধান্য বেশি। পাতা ও বোঁটার সংযোগস্থলের উপরিভাগ লাল রঙবিশিষ্ট যা জাতটির শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। জীবনকাল ১৮০-২৭০ দিন। লতি লম্বায় ৯০-১০০ সেমি., সামান্য চ্যাপ্টা, হালকা পিংক রঙ বিশিষ্ট। লতি সিদ্ধ করলে সমানভাবে সিদ্ধ হয় এবং গলা চুলকানিমুক্ত অর্থাৎ এ কচুতে ক্যালসিয়াম অক্সালেট এর পরিমাণ কম থাকায় গলা চুলকায় না।

কচু রোপণের সময়
কচুর লতি চাষ করার জন্য সেপ্টেম্বর মাসে জমির লতি তোলা শেষ হবার আগেই লতির আগায় জন্মানো চারা সংগ্রহ করতে হবে। তারপরে সংরক্ষিত চারাগুলোকে আলাদা কোনো জায়গায় পুঁতে রাখতে হবে। জমিতে এসব চারা পুনরায় শীতের আগে লাগালে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মার্চ মাসে এসব গাছে লতি আসে।
বংশবিস্তার : পূর্ণবয়স্ক পানিকচুর গোড়া থেকে যেসব ছোট ছোট চারা উৎপন্ন হয় সেগুলোই বীজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

চারা রোপণ পদ্ধতি
পানিকচুর চারা কম বয়সী হতে হয়। চার থেকে ছয় পাতার সতেজ চারাগুলোই রোপণের জন্য নির্বাচন করতে হয়। রোপণের সময় চারার ওপরের দুই থেকে তিনটি পাতা রেখে নিচের বাকি সব পাতা ছাঁটাই করে দিতে হয়। চারার গুঁড়ি বা গোড়া বেশি লম্বা হলে কিছুটা শিকড়সহ গুঁড়ির অংশবিশেষ ছাঁটাই করে দেয়া যেতে পারে। সারি থেকে সারি ৬০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছ ৪৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে চারা রোপণ করতে হয়। চারা রোপণে মাটির গভীরতা ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার রাখতে হয়।

কচু রোপণের নিয়ম
কচুর লতি চাষ করার ক্ষেত্রে প্রথমে জমি তৈরি করে নিতে হবে। এজন্য জমিতে ৩ থেকে ৪টি চাষ দিয়ে মাটি সমান করে নিতে হবে। কচুর লতির চারা জমিতে সারিবদ্ধভাবে লাগাতে হবে। সারিতে চারা লাগালে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩৮০০০ চারা লাগবে।
কচুর লতির চারা হিসেবে গুঁড়িচারা লাগানো হয়। অক্টোবর মাসে চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় এসময় চারা লাগালে ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে লতি পাওয়া যায়।

লতিকচুর পরিচর্যা
মূল জমিতে চারা রোপণ করতে দেরি হলে পানিকচুর চারা ভেজা মাটি ও ছায়া যুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে। জমিতে চারা রোপণের সময় চারা যাতে হেলে না পড়ে সে জন্য মাটি কাদা করার সময় বেশি নরম করা যাবে না।
গাছ কিছুটা বড় হলে গোড়ার হলুদ পাতা বা শুকিয়ে যাওয়া পাতা ছাঁটাই করে দিতে হবে। ক্ষেতে কোনো প্রকার আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবে না সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে।
পানি কচুর গাছে লতি আসার সময় ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। আবার একেবারে শুকনো রাখা যাবে না, শুকনো রাখলে লতি কম বের হয় বা দৈর্ঘ্য কম হয়।

সার প্রয়োগ পদ্ধতি
কচুর লতির ভালো ফলন ও বেশি ফলন পেতে হলে জমিতে অবশ্যই সার দিতে হবে। কচুর লতি চাষ করার জন্য বিঘাপ্রতি ৫০০ কেজি গোবর, ২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৮ কেজি টিএসপি ও ২৫ কেজি এমওপি সার দিতে হবে। কচুর লতি চাষ করার সময় সব সার একত্রে দেয়া যাবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে ইউরিয়া ব্যতীত সব সার জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে।
চারা লাগানোর ২০ থেকে ২৫ দিন পরে জমিতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হবে। কচুর লতি চাষ করার ক্ষেত্রে সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা থাকতে হবে। চারা লাগানোর সময় জমিতে বদ্ধ পানি না থাকলে প্লাবন সেচ দিয়ে জমি কাদা করতে হবে। জমি শুকিয়ে গেলে পানি কচু গাছের ক্ষতি হয়। তাই বৃষ্টি না হলে জমিতে প্রবাহমান পানি না থাকলে সেচ দিতে হবে।

সেচ ও আগাছা দমন
কচুর লতির জমিতে লতি কচুর গোড়ায় সব সময় পানি থাকতে হবে এবং দাঁড়ানো পানি মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করতে হবে। জমিতে সবসময় পানি থাকলে আগাছার উপদ্রব কম হয়। আগাছার মধ্যে শামুক আশ্রয় নেয় ও কচুর লতি গাছে উঠে পাতা খায়। তাই এসব আগাছা হাতে টেনে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। কচু একটি জলজ উদ্ভিদ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে লতি উৎপাদনের সময় জমিতে পানি ধরে রাখা উচিত নয়। জমিতে জো থাকলে লতি বেশি বের হয়।
কচুর রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা

কচুর সাধারণত কোনো রোগ দেখা যায় না তবে রোগের মধ্যে কচুর পাতার মড়ক রোগ হয়ে থাকে। পাতার উপরে বাদামি থেকে বেগুনি রঙের গোলাকার দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে এ সমস্ত দাগ আকারে বড় হয়ে একত্র হয়ে যায় এবং পাতা ঝলসে যায়। পরে এ দাগ কচু ও কন্দে বিস্তার লাভ করে।
পরপর ৩-৪ দিন বৃষ্টি ও উচ্চতাপমাত্রা থাকলে এ রোগের মাত্রা বেড়ে থাকে।
া এ রোগের অন্যতম উৎস হল আক্রান্ত বীজ। বীজে সাধারণত ছত্রাকটির মাইসেলিয়াম থাকে, তাই রোগ দমনের জন্য রোগমুক্ত এলাকা থেকে সুস্থ বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
া গাছের রোগাক্রান্ত পাতা ছেটে ফেলা এবং ফসল সংগ্রহের পর জমিতে পড়ে থাকা করম ও পাতা ধ্বংস করতে হবে।

া জমিতে রোগ দেখা মাত্রই ডাইমেথোমর্ফ + মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (এক্রোবেট এম জেড) অথবাফেনামিডন + মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন : সিকিউর ৬০০ ডব্লিউজি) অথবা মেটালেক্সিল + মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন : রিডোমিল গোল্ড) অথবা মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক (ইন্ডোফিল এম-৪৫) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছের পাতা উপরে ‍ও নিচে ভিজিয়ে ৭-১০ দিন পরপর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।
আগাম কচুর লতি চাষ করা হলে ক্ষুদ্র লাল মাকড় বা রেড স্পাইডার মাইট কচু পাতার ক্ষতি করতে পারে। কচুর লতির ক্ষেত মাকড় আক্রমণ করলে পাতার সবুজ রঙ নষ্ট হয়ে বিন্দু বিন্দু শুকনো দাগে ভরে যায়। মাকড় পোকা দূরীকরণে পানিতে গুঁড়ো সাবান ও ওমাইট বা ভার্টিমেক মাকড়নাশক মিশিয়ে পাতার উল্টো পাশে স্প্রে করতে হবে। কচুর পাতার নিচের দিকে লাল রঙের ক্ষুদ্র মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। এদেরকে খালি চোখে দেখা যায় না। পূর্ণ বয়স্ক এবং নিম্ফ উভয়ই গাছের ক্ষতি করে থাকে।
প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ মিলি. এবামেকটিন (ভার্টিমেক ১.৮ ইসি) পানির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর পাতার উভয় পৃষ্ঠে স্প্রে করলে লাল মাকড় দমন করা যায়।
আবার অনেক সময় দেখা যায় কচুর লতির ক্ষেতে লেদা পোকার আক্রমণ হয়ে থাকে। ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি স্প্রে করে লেদা পোকা দমন করা যায়। আক্রমণ তীব্র হলে কুইনালফস গ্রুপের কীটনাশক (দেবীকুইন ২৫ ইসি/কিনালাক্স ২৫ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি. লিটার পরিমাণ মিশিয়ে স্প্রে করে এ পোকা দমন করা যায়।

কচু পাতার ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক ছিটানোর সময় ডিটার্জেন্ট-সার্ফ/হুইল পাউডার ২০ গ্রাম/১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। তা নাহলে ঔষধ পাতা থেকে গড়িয়ে পড়ে যাবে।

পরিপক্ব কচুর ফলন ও সংগ্রহ
কচুর লতি যেকোনো বয়সেই গাছ থেকে তুলে খাওয়া যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে ছোট সাইজের লতি গাছ থেকে তুললে লতির ফলন কমে যায়। তাই ক্ষেতের সবচাইতে বড় বড় আর মোটা মোটা লতিগুলো তুলতে হবে। রোপণের ২ মাস পর থেকে ৭ মাস পর্যন্ত লতি হয়ে থাকে। চারা রোপণের ৬০-৯০ দিনের মধ্যে লতি তোলার উপযোগী হয়। ১০-১৫ দিন পরপর লতি সংগ্রহ করা যায়। লতি সংগ্রহের পর ১৫-২০ দিনের মধ্যে কা- বা রাইজোম (ৎযরুড়সব) সংগ্রহের উপযোগী হয়।
শেয়ার করুন:

কমেন্টস (0)

এখনো কোনো কমেন্ট করা হয়নি। প্রথম কমেন্টটি আপনিই করুন!

একটি কমেন্ট লিখুন