হোমপেজে ফিরে যান
ড. মো: হুমায়ূন কবীর 20 Jul, 2026

হাওড়ে ও নিচু জলাবদ্ধ পতিত জমিতে ভাসমান বেডে সবজি চাষ

হাওড়ে ও নিচু জলাবদ্ধ পতিত জমিতে ভাসমান বেডে সবজি চাষ
হাওড়ে ও নিচু জলাবদ্ধ পতিত জমিতে ভাসমান বেডে সবজি চাষ
ড. মো: হুমায়ূন কবীর

ভাসমান বেডে সবজি চাষের গুরুত্ব
এ দেশের নিম্নাঞ্চল বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, বরিশাল, মাদারীপুর, ভোলা, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সাতক্ষীরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রভৃতি জেলার একটি বিরাট অংশ বছরের অনেকটা সময় ধরে জলাবদ্ধ থাকে। বছরের প্রায় ৬ (জুন থেকে নভেম্বর) মাস এসব এলাকা জলামগ্ন ও পতিত থাকে। এ সময় এসব এলাকা সাধারণত কচুরিপানা ও জলজ আগাছায় পূর্ণ থাকে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার, সিলেট, শরীয়তপুর, যশোর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ প্রভৃতি এলাকাও বন্যাপ্রবণ ও এসব জেলার বেশ কিছু জমি মৌসুমী জলাবদ্ধতার শিকার। এসব এলাকার জলামগ্ন জমিগুলোর কচুরিপানা স্তুপ করে ভেলার মতো ধাপ বানিয়ে তার উপরে বিভিন্ন শাকসবজি ও মশলার চারা উৎপাদন ও চাষ করে সহজেই কৃষকরা তাদের খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে পারেন এবং সেসব চারা ও সবজি বিক্রি করে আয় বাড়াতে পারেন।

ভাসমান বেডে ফসল চাষের সুবিধা
ভাসবান বেডে সবজি ও মশলা চাষ কারা একটি লাগসই প্রযুক্তি; ভাসমান পদ্ধতির মাধ্যমে নিচু, পতিত ও জলামগ্ন অনাবাদী জমিকে চাষের আওতায় আনা যায়; স্থায়ী জলাবদ্ধ এলাকায় (খাল, হাওড় বা হ্রদ) সারা বছর ভাসমান পদ্ধতির মাধ্যমে সবজি ও মশলা উৎপাদন করা যায়; ভাসমান পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও জৈব পদ্ধতিতে ফসল আবাদ করা যায়; এই পদ্ধতিতে চাষে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও মৌসুমী বন্যায় ফসলের তেমন ক্ষতি হয় না; ভাসমান পদ্ধতির মাধ্যমে খুব কম সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করা যায়; ভাসমান পদ্ধতিতে চাষের খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম; ভাসমান পদ্ধতিতে চাষের জন্য আলাদা ভাবে সেচের জন্য কৃষকদের বাড়তি পরিশ্রম করার প্রয়োজন পড়ে না; ভাসমান পদ্ধতীর মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠির খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির যোগান বাড়ানো যায়; ভাসমান।

ভাসমান বেড/ধাপের উপকরণ
আমাদের দেশে ভাসমান বেড পদ্ধতিতে চাষের জন্য প্রধান উপকরণ হচ্ছে কচুরিপানা। তাছাড়া আমন ধানের খড় এবং বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ যেমন- টোপানা, কুটিপানা, কাঁটাশ্যাওলা, সোনা শেওলা, ইন্দুরকানিলতা, দৃলালীলতা, বিন্দালতা প্রভৃতি ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বাঁশ, কাটারী, নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া, তুষ, নৌকা প্রভৃতি প্রয়োজন। বর্তমানে আমন ধানের খড়ের অভাবে শুধু কচুরিটপানা ব্যবহার করে বেড/ধাপ তৈরি করা হচ্ছে।
ভাসমান বেড / ধাপ তৈরির সময়
আমাদের দেশে বর্ষার শুরুতে সাধারণত আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে এই ভাসমান বেড তৈরি করা হয়। এলাকাভেদে জ্যৈষ্ঠ মাসে থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত বেড তৈরি করা যায়। এছাড়াও কার্তিক-অগ্রাহয়ণ মাসে আবদ্ধ কচুরিপানা থাকে। সেই কচুরিপানা ও অন্যান্য আবর্জনা, ধানের খড়/অবশিষ্টাংশ, আগাছা, শেওলা প্রভৃতি স্তুপ করে শুকনা স্থানে বেড তৈরি করে রাখা যায়। যা পরবর্তী মৌসুমে পানি আসার সাথে সাথে ভেসে উঠে এবং শাক-সবজি চাষের উপযুক্ত হয়।

ভাসমান বেড তৈরির পদ্ধতি
কচুরিপানা, টোপা পানা, শ্যাওলা, বিভিন্ন ধরনের জলজ আগাছা, ধানের খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ প্রভৃতি ব্যবহার করে ভাসমান বেড/ধাপ তৈরি করা যায়। তবে কচুরিপানা দিয়ে ধাপ তৈরি করা উত্তম, সাধারণত এক শতাংশ আয়তনের ভাসমান বেড তৈরি করতে প্রায় ৫ শতাংশ জায়গার কচুরিপানার দরকার হয়। কচুরিপানা গাদা করে বেড /ধাপ তৈরি করতে হবে। কচুরিপানার বেড তৈরির পর তার ওপর এক স্তর বিন্দাল লতা (এক ধরনের ঘাসজাতীয় আগাছা) বিছিয়ে তার উপর ১৫-২০ সেন্টিমিটার পুরু করে পচা টোপাপানা/কচুরিপানা বা কয়ার ডাস্ট (নারিকেলের ছোবড়ার গুড়া) বিছিয়ে দিতে হবে। সাধারণত ভাসমান বেডের মাপ হয় ২০-২২ হাত (১০ মিটার) লম্বা, ২.৫ হাত (১.২৫ মিটার) থেকে ৪-৫ হাত (২ মিটার) চওড়া এবং পানির উপরে ২ থেকে ২.৫ হাত (১ মিটার) উঁচু হয়ে থাকে।

নিচে বেড বা ধাপ তৈরির পদ্ধতি ধারাবহিকভাবে বর্ণনা করা হলো-
পানিতে ভেসে থাকা কচুরিপানার স্তর যেখানে ঘন, লম্বা ও ভরাট এমন জায়গা বেছে নিতে হবে। পানির উপরে ভেসে থাকা কচুরিপানার প্রাকৃতিক স্তর সম্পূর্ণ নষ্ট করা যাবে না। তা হলে স্তর সাজানোর সময় স্তর একটু মোটা হলেই কচুরিপানা ভেসে চলে যাবে; কচুরিপানার ঘন, লম্বা ও পুরো স্তরের ওপর একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যরে বাঁশ ফেলতে হবে; এরপর বাঁশের উপর দাঁড়িয়ে শরীরের ভারসাম্য ঠিক রেখে দুপাশ থেকে কচুরিপানা টেনে এনে বাঁশের উপর স্তরে স্তরে সাজাতে হবে; কচুরিপানার স্তর সাজানোর সময় কচুরিপানা পানিতে যেভাবে থাকে সেভাবে ঘন করে অর্থাৎ খাড়া করে সাজাতে হবে। পরবর্তী অর্ধেক স্তর সাজানোর সময় কচুরিপানা উল্টো করে সাজাতে হবে অর্থাৎ এর শিকড় উপরের দিকে থাকতে হবে; তারপর পা দিয়ে চেপে চেপে উঁচু স্তর তৈরি করা হয় যাতে কোন গ্যাপ বা ফাঁকা জায়গা না থাকে; এরপর স্তুপের উপরে উঠে প্রয়োজনীয় কচুরিপানা তুলে মাপ অনুযায়ী বেড/ধাপ তৈরি করা হয়। বেড/ধাপের উপরের অংশে অপেক্ষকৃত ছোট কচুরিপানা, খুদিপানা, টোপপানা দেওয়া ভালো; বেড/ধাপের সাথে প্রাকৃতিক স্তর হিসেবে পানিতে লেগে থাকা বা বাড়তি অংশ ধারালো দা বা হাসুয়া দিয়ে কেটে দিতে হবে; লাল শাক, ডাটা, পালং, মুলা ইত্যাদির জন্য বেডের উপর পচা কচুরিপানা (সামান্য সারলা মাটি, জৈব সার, কেঁচো সার) সারের স্তর দিতে হবে; বন্যা, ঢেউ বা জোয়ার ভাটার স্রােত থাকলে বেডের মাঝামাঝি জায়গায় বাঁশের খুঁটি বা বেডের চারপাশে ফ্রেম দিতে হবে।

ভাসমান বেডে আবাদ পদ্ধতি
ভাসমান বেড/ধাপ তৈরির পর বীজ বুনে বা চারা তৈরি করে তা লাগিয়ে ফসল উৎপাদন করা যায়। বেড/ধাপের জন্য সাধারণত কচুরিপানা বলে বা দৌলায় চারা তৈরি করা হয়। চারা তৈরি করতে পচা টোপাপানা বা কচুরিপানা লাগে। চারার জন্য উন্নত জাতের বীজ দরকার। প্রথমে পচা কচুরিপানার মধ্যে অতিরিক্ত পানি থাকলে তা চিপে ফেলে দিয়ে বল বা বিড়া তৈরি করতে হবে। ব্যাগেও চারা তৈরি করা যায়। প্রতিটি বলে ২টি, বিড়ায় ৩টি এবং ব্যাগে (মাদার জন্য) ৪-৭টি বীজ বুনতে হবে। বল বা বিড়াগুলোকে সমতল উঠানের একপাশে বা মাচায় সাজিয়ে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে ঝাঁঝরি দিয়ে পানি দিতে হবে।

বল পদ্ধতিতে বীজ বপন ও চারা তৈরি
পচা কচুরিপানা দিয়ে নরম অবস্থায় বল তৈরি করা হয়; বল তৈরির সময় আলতো চাপ দিয়ে বলের অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে; বলের মধ্যে কাক্সিক্ষত বীজ দিয়ে ছায়ার মধ্যে রেখে দিতে হবে; বল শুকিয়ে গেলে মাঝে মাঝে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে; সাধারণত একটি বলের মধ্যে ২টি বীজ দেয়া হয়; চারার বল তৈরি এ কাজটি সাধারণত কৃষকের বাড়িতেই করা হয়; চারার বলের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার পার তা সারিবদ্ধভাবে বেডের ওপর স্থাপন করা হয়।
বেডে/ধাপে বীজ বোনা ও চারা রোপণ পদ্ধতি
ভাসমান বেড তেরির পর উপরিভাগ আবাদ উপযোগী হতে প্রায় ১৫-২০ দিন সময় লাগে। বেড তৈরির পর তাতে সারি করে সরাসরি বীজ বোনা যায়। আবার বরে বা বিড়ায় তৈরি করা চারা নির্দিষ্ট দূরত্বে বেডে রোপণ করা যায়। আদা, রসুন, কচু প্রভৃতি ফসল সরাসরি রোপণ করা যায়। চারা ৫-৬ ইঞ্চি হলে এবং শিকড়ের মাথা বল থেকে বের হলেই (কারো হওয়ার আগেই) বেডে লাগাতে হবে। বিড়া বা ব্যাগের চারা একত্রে বেড়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ গর্ত/জায়গা করে রোপণ করতে হবে। বিড়া বা ব্যাগের অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত চারা বোগিং বা ফেলে দিতে হবে। বল/বিড়ার আকার ছোট হলে পাশের্^ পচা কচুরিপানার আস্তরণ দিতে হবে। নতুন আস্তরণের সাথে ১-২ চা চামুচ জৈব সার প্রয়োগ করলে চারার তাড়াতাড়ি বাড়বে। চারা লাগানোর পর সামান্য পানি দিয়ে চারা ও চারার গোড়া ভিজিয়ে দেয়া আবশ্যক। চারা বেশি লম্বা হলে বাউনি/জাংলা দিতে হবে।

ভাসমান বেডের ফসল সংগ্রহের পদ্ধতি
ভাসমান বেডের উপর সচারাচর উঠা যায় না। এ কাজে নৌকা বা কলাগাছের ভেলা ব্যবহার করা হয়ে থাকে; ফসলের ধরন ও প্রয়োজন বুঝে সপ্তাহে ২-৩ দিন ফসল তোলা হয়; বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাসমান বেড/ধাপে ফসল লাগানো ও সময়মতো ফসল তোলা উচিত; সাধারণত এক থেকে দুই মৌসুম বা যতদিন পর্যন্ত ভাসমান বেড/ধাপ সবজি চাষের উপযুক্ত থাকে ততদিন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সবুজ ও চারা উৎপাদন করা যায়। বেড/ধাপ যতো পুরু হবে, ফসলও ততো বেশিদিন ধরে সেখানে উৎপাদন করা যাবে।
শেয়ার করুন:

কমেন্টস (0)

এখনো কোনো কমেন্ট করা হয়নি। প্রথম কমেন্টটি আপনিই করুন!

একটি কমেন্ট লিখুন